রাষ্ট্র বনাম জনগণ

নাগরিক অধিকারের সংকট ও উত্তরণের পথ

আল মামুন

“সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের সমালোচনাকে যখন অতিউৎসাহী মহল ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করতে ভালোবাসে, তখনই মূলত নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের মূল দ্বন্দ্বের পথটি উন্মুক্ত হয়। একজন সচেতন নাগরিক যখন সরকারের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা অন্যায়ের প্রতিবাদ জানায়, তখন সে মূলত: রাষ্ট্রকে সংস্কার ও শক্তিশালী করতে চায়। কিন্তু যখন সেই প্রতিবাদকে রাষ্ট্রযন্ত্র কঠোর হস্তে দমন করে, তখন নাগরিক নিজেকে নিজস্ব রাষ্ট্রেই বিচ্ছিন্ন ও উৎপীড়িত মনে করতে বাধ্য হয়।”

রাষ্ট্র কোনো অলৌকিক সত্তা নয় বরং এটি গড়ে উঠেছে মানুষের নিরাপত্তাসংক্রান্ত মৌলিক প্রয়োজন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং পারস্পরিক কল্যাণ সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধ্রুপদী দর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক গণতান্ত্রিক মতবাদ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি কথা স্পষ্ট, রাষ্ট্রের মূল উপাদানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্রের জনগণ।
রাষ্ট্র মূলত মানুষের কল্যাণ ও সুরক্ষার জন্যই তৈরি হয়েছে; মানুষ কোনোভাবেই রাষ্ট্রের যান্ত্রিক কিংবা রাজনৈতিক চাল চালার উপকরণ নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, যখনই রাষ্ট্র এবং জনগণের সম্পর্ক একটি পারস্পরিক অংশীদারিত্ব ও নিরাপত্তার জায়গা থেকে সরে এসে চরম মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায়, তখন সেখানে সৃষ্টি হয় এক গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক সংকট।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, একটি বড় প্রশ্ন প্রায় দেখা যায়। এই প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্র আসলেই সাধারণ মানুষের সেবায় নিয়োজিত, নাকি রাষ্ট্রযন্ত্র ধীরে ধীরে মানুষের বিপক্ষে একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে? রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যে এই সংঘর্ষ বোঝার জন্য, প্রথমেই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হবে। এটি হলো ‘রাষ্ট্র’ এবং ‘সরকার’ এর মধ্যে পার্থক্য। এই দু’টি ধারণার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমানা রয়েছে, যা প্রায়শই অস্পষ্ট হয়ে যায়। আর এই কারণে সৃষ্টি হয় নানা বিরোধের।

রাষ্ট্র হলো একটি স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো। এটি ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, শাসনব্যবস্থা এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে গঠিত। রাষ্ট্র চিরস্থায়ী এবং এটি দেশের সকল স্তরের নাগরিকের জন্য সার্বজনীন আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে।

অন্যদিকে, সরকার হলো নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জনগণের জনম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রকে পরিচালনা করার দায়িত্ব পাওয়া একটি পরিবর্তনশীল শক্তি। সংকট তৈরি হয় যখন শাসন ক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠী নিজেদেরই ‘রাষ্ট্র’ বলে মনে করতে শুরু করে।

সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের সমালোচনাকে যখন অতিউৎসাহী মহল ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করতে ভালোবাসে, তখনই মূলত নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের মূল দ্বন্দ্বের পথটি উন্মুক্ত হয়।

একজন সচেতন নাগরিক যখন সরকারের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা অন্যায়ের প্রতিবাদ জানায়, তখন সে মূলত রাষ্ট্রকে সংস্কার ও শক্তিশালী করতে চায়। কিন্তু যখন সেই প্রতিবাদকে রাষ্ট্রযন্ত্র কঠোর হস্তে দমন করে, তখন নাগরিক নিজেকে নিজস্ব রাষ্ট্রেই বিচ্ছিন্ন ও উৎপীড়িত মনে করতে বাধ্য হয়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের মূল সুরই হলো রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এই সংবিধানে নাগরিককে মতপ্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ করার অধিকার এবং আইনের দৃষ্টিতে সমান আশ্রয় পাওয়ার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখন এই সাংবিধানিক অধিকারগুলো বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন আমরা এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার বদলে শাসক গোষ্ঠীর ক্ষমতার স্থায়িত্ব রক্ষায় বেশি তৎপর হয়ে ওঠে, তখন সংবিধানে লিখিত ‘জনগণের মালিকানা’ শব্দটি কেবল ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়। সংবিধানে নাগরিককে ‘প্রজা’ নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রকৃত ‘মালিক’ বলা হয়েছে। অথচ রাষ্ট্রযন্ত্রের দৈনন্দিন আচরণে যখন নাগরিককে কোনো দ্বিতীয় শ্রেণির প্রজা বা কেবল বাধ্যগত সত্তা হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়, তখন রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার মেলবন্ধন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যেকোন সভ্য রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া। আইন রক্ষা করার জন্য পুলিশ, বিচার বিভাগ, এবং প্রশাসন আছে। এগুলো তৈরি হয়েছে নাগরিকদের অবিচার থেকে রক্ষা করতে। কিন্তু যখন এই প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আধুনিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন থাকা উচিত, যেখানে সবাই আইনের চোখে সমান এবং আইন সবার জন্য একইভাবে প্রয়োগ হয়।

কিন্তু রাষ্ট্র যখন বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তিকে সুরক্ষা দিতে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, কিংবা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তাকে সংকুচিত করে ফেলে, তখন তা আর আইনের শাসন থাকে না; বরং তা পরিণত হয় ‘আইন দিয়ে শাসনে’। এর পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রী বিচারপ্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যখন ন্যায়বিচার পাওয়া সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের সার্বিক ন্যায়পরায়ণতার ওপর থেকেও জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে।

রাষ্ট্র এবং নাগরিকের সম্পর্ক আসলে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মতো। একজন নাগরিক যখন প্রতিদিন চা কেনে, কেনাকাটা করে বা উপার্জন করে, তখন সে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রকে কর দেয়। এটি একজন দিনমজুর থেকে শুরু করে একজন বড় ব্যবসায়ী পর্যন্ত – সবাই রাষ্ট্রের তহবিল এবং প্রশাসনিক কাজগুলিকে চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের উপার্জনের একটি অংশ দেয়। রাষ্ট্র এই অর্থনৈতিক অবদানের বিনিময়ে নাগরিকদেরকে তিনটি মূল প্রতিশ্রুতি দেয়: জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, ভালো জনসেবা এবং সুষম অবকাঠামোগত উন্নয়ন। কিন্তু বাস্তবে, এই প্রতিশ্রুতিগুলি খুব কমই পালিত হয়। যখন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি ও আমলারা নাগরিকের করের টাকায় বিলাসিতা করে, অথচ সাধারণ মানুষ একটি সরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা পেতেও অক্ষম হয় বা সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ ও হয়রানির শিকার হয়, তখন সামাজিক চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য, নাগরিক সেবার মানহীনতা, এবং জবাবদিহিতাহীন অর্থ খরচ রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সামাজিক দূরত্বকে দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতির উন্নতি করার জন্য রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণ করতে হবে এবং নাগরিকদেরকে তাদের অধিকার প্রদান করতে হবে। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া হতে পারে, কিন্তু এটি আমাদের সমাজের জন্য অপরিহার্য।

একইভাবে, আমাদের প্রশাসনের সংগঠনে ঔপনিবেশিক যুগের মানসিকতার স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়। ‘আমলা’ বা কর্মকর্তা শব্দটির মূল অর্থ হলো জনগণের সেবক। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষের জন্য এটি কখনো আনন্দদায়ক হয়নি। সরকারি দপ্তরে যাওয়া এবং সেবা পাওয়ার সময় কর্মকর্তাদের একটি প্রভুত্বশীল মনোভাব দেখা যায়। এটি নাগরিককে রাষ্ট্র থেকে দূরে ঠেলে দেয়। কর্মকর্তারা নাগরিককে সেবা দেওয়াকে আইনি বা নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে মনে করেন না। অনেক সময় তারা এটিকে অনুগ্রহ বা খেয়ালখুশি হিসেবে দেখেন। একটি আধুনিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্র স্বচ্ছ, গতিশীল এবং নাগরিকবান্ধব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাঠামোগত জবাবদিহিতা না থাকায় প্রশাসন নিজেদের স্বার্থ ও ক্ষমতা রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষের সমস্ত ক্ষোভ ও অসন্তোষ রাষ্ট্রের ওপর ফেলে দেয়।

ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখনই অতিরিক্ত স্বৈরাচারী, নিয়ন্ত্রণমুখী বা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে উঠেছে, তখনই সমাজ ও সাধারণ মানুষ তার অধিকার পুনরুদ্ধারে সোচ্চার হয়েছে। জনগণ কখনো দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য কিংবা শোষণ নীরবভাবে মেনে নেয়নি। বিশেষ করে আজকের তরুণ প্রজন্ম বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিজেদের নাগরিক অধিকার সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন ও সংবেদনশীল। রাজপথে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের উত্থাপিত দাবি ও প্রতিবাদগুলো আসলে রাষ্ট্রের ভিত্তি ধ্বংস করার জন্য নয়; বরং রাষ্ট্রকে তার ভুল পথ থেকে ফেরানোর এক প্রজ্ঞাপূর্ণ তাগিদ। রাষ্ট্র যদি তরুণ ও সাধারণ মানুষের এই ন্যায্য ক্ষোভ ও পরিবর্তনের চাহিদাকে শত্রুতা বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে গণ্য করে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে স্তব্ধ করতে চায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নিজস্ব স্থিতিশীলতা ও সামাজিক বুননকেই এক অনিশ্চিত ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।

একটি সুস্থ, সভ্য এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সমাজের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকা দরকার। এই সমস্যাগুলি থেকে বের হতে হলে বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার।

প্রথমত, সব রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রের নেতাদের বুঝতে হবে যে সরকারের সমালোচনা করা আর রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা এক জিনিস নয়। সরকারের ভুল নীতিগুলো দেখিয়ে দেওয়া প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের কাজ। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন এবং পুলিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তারা যাতে সংবিধান ও জনগণের সেবায় কাজ করতে পারে, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়। পাশাপাশি, প্রশাসনিক কাজে দুর্নীতি বন্ধ করতে এবং সেবা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও জবাবদিহিমূলক করা খুব দরকার।

শেষমেষ রাষ্ট্র আর জনগণের মধ্যে কোনো জয়-পরাজয় হতে পারে না। কারণ জনগণ ছাড়া রাষ্ট্র কিছুই হয় না, মাত্র একটি মানচিত্র। যখন রাষ্ট্র জনগণকে ভয় পায় বা প্রতিপক্ষ মনে করে তখন দুর্ঘটনা ঘটে। আর যখন রাষ্ট্র জনগণকে ভালো করে মনে রাখে এবং স্বচ্ছ থাকে তখন একটি ভালো গণতান্ত্রিক সমাজ তৈরি হয়। এখন রাষ্ট্রের নেতারা বুঝতে হবে যে ভয় দেখিয়ে বা দমন করে স্তব্ধতা আনা অসম্ভব। রাষ্ট্র জনগণের কাছে ফিরে আসতে হবে। সাধারণ মানুষের রক্ত আর ঘামে তৈরি রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য নিরাপদ জায়গা হতে হবে। কোনো ভয় না থাকা এটাই মানুষের প্রধান আশা।

লেখক : শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন